কফি স্বাস্থকর কতটুকু আর ক্ষতিকর কতটুকু আসুন জেনে নেই
আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন যাঁরা দিনের শুরুটা এক কাপ Coffee দিয়ে করেন। এছাড়াও সারাদিনে যখনই মন চায় কিংবা এনার্জিতে ঘাটতি হয়েছে বলে মনে হয়, তখনই এক কাপ কফি খেয়ে নিই। দিনে অন্তত সাত থেকে আট কাপ কফি হামেশাই খেয়ে থাকেন বহু মানুষ। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, কফি শরীরের অনেক উপকারই করে। কিন্তু অত্যধিক মাত্রায় কফি পান মোটেই স্বাস্থ্যকর নয়। বরং শরীরে বেশ ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।
কফি খাওয়ার একটা নিয়ম রয়েছে বলে মত তাঁদের। সেই নিয়মের বাইরে গেলেই স্বাস্থ্যকর কফি হয়ে উঠতে পারে ক্ষতিকর। তবে, কফি খাওয়ার সময় কোন কোন বিষয়গুলো অবশ্যই খেয়াল রাখতে বলছেন আয়ুর্বেদ বিশেষজ্ঞরা?
কফি বিন হল পলিফেনল ক্রিয়াকলাপের একটি শক্তিঘর। পলিফেনলগুলি এমন উদ্ভিদে পাওয়া যায় যেগুলিতে উচ্চ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, যা ভিতরে থেকে ক্ষতিকারক মুক্ত র্যাডিকেলগুলির বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে। ফ্রি র্যাডিক্যালস বা অস্থির অণু ডিএনএ এবং প্রোটিনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, কিন্তু কফিতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্টগুলি তাদের থেকে আমাদের রক্ষা করে। ঘরে তৈরি করা আট আউন্সের এক কাপ কফিতে সাধারণত ১০০ মিলিগ্রামের মতো ক্যাফেইন থাকে। প্রাপ্তবয়স্ক একজন মানুষের জন্য মোটামুটি ৪০০ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন দৈনিক পান করা নিরাপদ। এর বেশি পান করলে অনিদ্রা, খিটখিটে মেজাজ, পেট খারাপের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
রোজ কফি খাওয়ার উপকারিতা
- কফিতে থাকা ক্যাফেনাইন এনার্জি বর্ধক। এই উপাদান শারীরিক ও মানসিক এনার্জি বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে।
- মস্তিষ্ক ভালো কাজ করে।
- চিন্তা শক্তি উন্নত হয় এবং দক্ষতা উন্নত হয়।
- টাইপ 2 ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কম থাকে। (যদি চিনি ছাড়া নেওয়া হয়)
- ডিমেনশিয়া এবং পারকিনসন্স রোগের ঝুঁকি কম থাকে।
- হতাশার ঝুঁকিও কমে যায়।
- লিভারের ক্ষতি এবং কলোরেক্টাল ক্যানসারের ঝুঁকি কম থাকে।
- কফিতে রয়েছে ক্যাফেইন ছাড়া পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ ও ভিটামিন বি।
- কফিতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্টস মন ভালো রাখে।
- যাদের মুড স্যুইংয়ের সমস্যা আছে তাদের কফি খাওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
- কফি অবসাদ কমাতেও বিশেষ ভাবে সাহায্য করে।
কফি খাওয়ার অপকারিতা
হৃদয়ের জন্য ভালো নয়: কিছু গবেষণায় দেখা গেছে ক্যাফেইন হৃদপিণ্ডের রক্তসরবরাহকরী ধমনীতে রক্ত চলাচল ধীর করে দেয়। বিশেষ করে যখন বেশি দরকার, যেমন: ব্যায়ামের সময়। তাছাড়া বুকধড়ফড়ানি, অনিয়মিত হৃদস্পন্দন বা উচ্চ রক্তচাপের জন্যেও শরীরের অতিরিক্ত ক্যাফেইন দায়ী।
ঘুমের ব্যঘাত: এক কথা অনেকেই জানেন, চা বা কফি খেলে ঘুম কম হয়। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, যারা দিনে তিন কাপের বেশি কফি পান করেন তাদের শান্তির ঘুম খুব কমই হয়। আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা কফি খান না তাদের থেকে কফি পানকারীদের ৭৯ মিনিট কম ঘুম হয়। তাই ঘুমের সমস্যা থাকলে কফিকে না বলুন।চিনির সঙ্গে আত্মিয়: যদিও অনেকে চিনি ছাড়া কফি পান করেন। তবে কফির সঙ্গে কেক, বিস্কুট বা সকালের নাস্তার অনেক পদেই থাকে চিনি। সবমিলিয়ে দেখা যায়, সারা দিনে হয়তো ১১ টেবিল-চামচ চিনি খাওয়া হয়ে যাচ্ছে। তাই যারা ওজন কমানোর চেষ্টায় আছেন, তাদের চেষ্টা তখন বিফলে যাবে।
মেজাজের জন্য খারাপ: ক্যাফেইন শরীরের অ্যাড্রেনালিন নামক একধরনের হরমোনের মাত্রা বাড়ায়। যে কারণে শরীরের টানটান উত্তেজনা বা ঘাবড়িয়ে যাওয়ার অনুভুতির মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
সন্তান ধারণে অক্ষমতা: দৈনিক পাঁচ কাপের বেশি কফি খেলে গর্ভধারণের ক্ষমতা কমে যেতে পারে। যদি মা হতে চান, তবে অবশ্যই কফি খাওয়ার পরিমাণ কমাতে হবে। আর গর্ভধারেণের পর কফি বাদ দিন। কারণ দৈনিক ২০০ মি.গ্রাম ক্যাফেইন শরীরে গেলে গর্ভের শিশুর ক্ষতি হওয়ার পাশাপাশি জন্মক্রটি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
দিনে কত কাপ কফি শরীরের পক্ষে ভাল
১ কাপ কফি
১ কাপ কফিতে প্রায় ১০০ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন থাকে। প্রতিদিন ১ কাপ কফি খাওয়া সতর্কতা বাড়ায় এবং মলত্যাগে সাহায্য করতে পারে।
২ কাপ কফি
ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অফ স্পোর্ট নিউট্রিশন ইউএস-এর মতে, যারা দিনে ২ কাপ কফি খান, তাঁদের ব্যায়ামের কর্মক্ষমতা উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখতে পান ।
৩ কাপ কফি
ইউরোপিয়ান জার্নাল অফ প্রিভেনটিভ কার্ডিওলজিতে প্রকাশিত একটি সমীক্ষা অনুসারে, একজন ব্যক্তি যদি দিনে ৩ কাপ বা তার বেশি কফি খান, তাহলে স্ট্রোকে…সম্ভাবনা ২১ শতাংশ কমে যায়। এছাড়া কার্ডিওভাসকুলার রোগের ঝুঁকি ১২ শতাংশ এবং মৃত্যুর ঝুঁকি ১৭ শতাংশ হ্রাস পায়।
৪ কাপ কফি
যাঁরা প্রতিদিন ৪ বা তার বেশি কাপ কফি খান, তাঁদের নন-অ্যালকোহলযুক্ত রোগের ঝুঁকি ১৯ শতাংশ কমে যায়। ইউনিভার্সিটি অফ সাউদাম্পটন এবং এডিনবার্গের গবেষণা অনুসারে, প্রতিদিন ৩-৪ কাপ কফি খেলে লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি ২১ শতাংশ কমে যায়।
৫ কাপ কফি
সুইডেনের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের গবেষণা অনুসারে, যারা দিনে ৫ কাপ কফি খান, তাঁদের টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি ২৯ শতাংশ কমে যায়। কফিবিনে উপস্থিত ক্যাফেইক অ্যাসিড এবং ক্লোরোজেনিক অ্যাসিড অ্যামাইলয়েড পলিপেপটাইডের জমাকে বাধা দিতে সাহায্য করতে পারে। যা ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষগুলোকে ধ্বংস করতে পারে।
৬ কাপ কফি
বোস্টন ইউনিভার্সিটির গবেষণা অনুযায়ী, ৬ কাপ কফি খেলে বাতের ঝুঁকি কমানো যায়। গবেষণা অনুসারে, যাঁরা প্রতিদিন ৬ কাপ কফি খান, তাঁদের আর্থ্রাইটিস হওয়ার সম্ভাবনা ৫৯ শতাংশ কম ছিল এবং যাঁরা প্রতিদিন ৫ কাপ কফি খান, তাদের সম্ভাবনা ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কম ছিল। ওয়েবএমডি অনুসারে, ক্যাফেইনযুক্ত কফি অনিদ্রা, নার্ভাসনেস, অস্থিরতা, পেট খারাপ, বমি বমি ভাব, বমি, হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি, শ্বাস-প্রশ্বাসের হার বৃদ্ধি, নিদ্রাহীনতার মতো অনেক সমস্যার কারণ হতে পারে। এ ছাড়া একটানা বেশি কফি খেলে মাথাব্যথা, দুশ্চিন্তা, কানে বাজতে পারে, অনিয়মিত হৃদস্পন্দন, মাথাব্যথা, বুকে ব্যথা হতে পারে। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের মতে, সাধারণ মানুষের ৪০০ মিলিগ্রামের বেশি কফি বা প্রায় ৪ কাপ কফি খাওয়া উচিত নয়। এই প্রতিবেদনটি সম্পূর্ণ তথ্যের জন্য। আপনি যদি কোনও রোগ এড়াতে বা চিকিৎসার জন্য বেশি কফি পান করতে চান, তবে প্রথমে একজন ডাক্তারের সঙ্গে প্রথমেই এ বিষয়ে পরামর্শ করুন ।
দিনে কত কাপ কফি শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর
সাধারণত এক কাপ কফিতে থাকে ৭০ থেকে ১৪০ মিলিগ্রাম ক্যাফিন থাকে। সেই হিসাব অনুযায়ী, একটি মানুষের দিনে ৪ থেকে ৫ কাপের বেশি কফি পান করা উচিত নয়। এছাড়া রাতেও কফি খাওয়া উচিত নয়। কারণ রাতের দিকে কফি খেলে ঘুমে সমস্যা হয়।
প্রয়োজনের অতিরিক্ত কফি খেলে কী কী সমস্যা হতে পারে?
১) বেশি কফি খেলে তার প্রতি আসক্তি তৈরি হতে থাকে। নির্দিষ্ট সময় অন্তর কফি না পেলে মেজাজ খারাপ হতে থাকে। মানসিক অবসাদ আসতে পারে।
২) ক্যাফিন প্রভাব ফেলে হৃদ্যন্ত্রেও। এর প্রভাবে হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। এমনকি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকেনা।
৩) প্রচুর পরিমাণে যাঁরা কফি খান, তাঁদের অনেকের ঘুম কমে যায়। ফলে মস্তিষ্কের কাজও ব্যাহত হয়। ঘুমের ঘাটতি অন্যান্য আরও অনেক শারীরিক সমস্যা ডেকে আনে। তাই সুস্থ থাকতে কফি খাওয়ার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন।

