ফজিলতপূর্ণ রাত লাইলাতুল কদর
লাইলাতুল কদরের বিধান অবতীর্ণ হয়েছে মদিনা শরিফে। কেননা সুরায়ে কদর মদিনা শরিফেই অবতীর্ণ হয়েছে। এটি বছরের মূল্যবান রাত। কিছু রাত-দিন আছে, যা নবীর জন্য মূল্যবান। আবার কিছু রাত-দিন আছে, যা আমাদের জন্য মূল্যবান। নবী করিম (সা.)-এর ক্ষেত্রে মূল্যবান রাত হলো :
১. তাঁর জন্মের রাত,
২. মেরাজের রাত,
৩. হিজরতের রাত। আর তাঁর ক্ষেত্রে মূল্যবান দিন হলো :
১. তাঁর জন্মের দিন,
২. নবুয়তের দিন,
৩. তার মৃত্যুর দিন। তাই এসব দিন-রাতে আমাদের জন্য কোনো ইবাদত নেই।
আর উম্মতের ক্ষেত্রে মূল্যবান রাত হলো :
১. লাইলাতুল কদর, ২. আরাফার রাত, ৩. জুমার রাত, ৪. শবেবরাত, ৫. রমজানের রাত, ৬. জিলহজ মাসের প্রথম দশ রাত, ৭. ঈদুল ফিতরের রাত, ৮. ঈদুল আজহার রাত, ৯. রজব মাসের প্রথম রাত।
আর উম্মতের জন্য মূল্যবান দিন হলো :
১. আরাফার দিন, ২. আশুরার দিন, ৩. শবেবরাতের দিন, ৪. জুমার দিন, ৫. রমজানের দিনগুলো, ৬. ঈদুল ফিতরের দিন, ৭. ঈদুল আজহার দিন, ৮. আইয়ামে বিজ (প্রতি মাসের চাঁদের ১৩, ১৪, ১৫ তারিখ)। ৯. জিলহজের প্রথম আট দিন, ১০. শাওয়ালের ছয় রোজার দিন।
ফজিলতপূর্ণ যত রাত আছে, তার মধ্যে সেরা রাত হলো লাইলাতুল কদর বা কদরের রজনী।
লাইলাতুল কদরের পরিচিতি
কদরের রজনীর পরিচিতি মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে নিজেই তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি এটা (কোরআন) অবতীর্ণ করেছি মহিমান্বিত রজনীতে। আর মহিমান্বিত রজনী সম্পর্কে তুমি কী জানো? মহিমান্বিত রজনী হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। ওই রাত্রিতে ফেরেশতারা ও রুহ (জিবরাইল) অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক কাজের জন্য তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে। শান্তিময় এই রাত ফজরের উদয় পর্যন্ত।’ (সুরা : কদর, আয়াত : ১-৫)
লাইলাতুল কদর কোন তারিখে লাইলাতুল কদর সম্পর্কে হাদিস
সাধারণত কদর রজনী শেষ দশকে হওয়াই বিশুদ্ধ অভিমত। হজরত আবু সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবু সায়িদকে জিজ্ঞেস করেছি, সে আমার বন্ধু ছিল। তিনি বলেন, আমরা নবী করিম (সা.)-এর সঙ্গে রমজানের মধ্য ১০ দিন ইতিকাফে ছিলাম। তিনি ২০ তারিখ সকালে বের হন এবং আমাদের উদ্দেশে ভাষণ দেন। ভাষণে বলেন, আমাকে কদরের রজনী দেখানো হয়েছিল, অতঃপর ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই তোমরা তা শেষ ১০ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে তালাশ করো। আমি নিজেকে মাটি ও পানিতে সিজদা করতে দেখেছি। তাই যারা রাসুলের সঙ্গে ইতিকাফে ছিল, তারা যেন ফিরে আসে। তখন আমরা ফিরে এসেছি। আমরা আকাশে কোনো মেঘ দেখিনি। হঠাৎ একরাতে মেঘ এলো, বৃষ্টি হলো, মসজিদের ছাদ ভেসে গেল। তা ছিল খেজুরগাছের ঢালের এবং নামাজ শুরু হলো, তখন আমি রাসুল (সা.)-কে দেখেছি, তিনি পানি ও মাটিতে সিজদা করছেন। এমনকি তাঁর কপালে মাটির চিহ্ন ছিল।’ (বুখারি, হাদিস : ২০১৬)
আরো স্পষ্টভাবে বলতে গেলে, শেষ দশকের বিজোড় রাতের মধ্যে শেষের দিকের কয়েকটি রাতে শবেকদর হওয়ার সম্ভাবনা খুবই বেশি।
সহিহ বুখারির অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘হজরত উবাদা ইবনে সামিত (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘নবী করিম (সা.) আমাদের কদরের রজনীর খবর দেওয়ার জন্য বের হয়েছেন। তখন দুজন মুসলিম পরস্পর ঝগড়া করে। তিনি বলেন, আমি বের হলাম তোমাদের কদরের রজনীর খবর দেওয়ার জন্য। কিন্তু অমুক অমুক ঝগড়া করে, অতঃপর তা তুলে নেওয়া হয়েছে। তাতে তোমাদের জন্য কল্যাণ থাকতে পারে। তাই তোমরা শেষের পঞ্চম, সপ্তম ও নবম তারিখে তালাশ করো।’ (বুখারি, হাদিস : ২০২৩)
অন্য হাদিসে এসেছে, হজরত ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, সাহাবাদের একদলকে শেষের সাত দিনে কদরের রজনী স্বপ্নে দেখানো হয়েছে। তখন রাসুল (সা.) বললেন, আমি তো দেখছি তোমাদের দেখা স্বপ্ন শেষের সাত দিনের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। তাই যে ব্যক্তি তা তালাশ করবে, সে যেন শেষের সাত দিনেই তা তালাশ করে।’ (বুখারি, হাদিস : ২০১৫)
প্রশ্ন হলো, প্রতিবছর লাইলাতুল কদর কি একই তারিখে হয়? এর জবাব হলো—ইমাম মালেক, আহমদ, সুফিয়ান সাওরি, ইসহাক ও আবু সাওর (রহ.) বলেন, লাইলাতুল কদর শেষ দশকে পরিবর্তন হতে থাকে।
তবে ইমাম আবু হানিফা, সাহেবাইন, ইমাম শাফেয়ি (রহ.) ও আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর মতে তা নির্দিষ্ট তারিখে হয়, পরিবর্তন হয় না। সাধারণত ইমাম শাফেয়ি লাইলাতুল কদর ২১ তারিখে হওয়ার কথা বলেছেন। আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, তা ২৭ তারিখে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
লাইলাতুল্ কদর’এ কি কি ইবাদত করবেন
প্রথমত: আল্লাহ তাআ’লা আমাদের বলে দিয়েছেন যে: এই রাত এক হাজার মাসের থেকেও উত্তম। অর্থাৎ এই এক রাতের ইবাদত এক হাজার মাসের থেকেও উত্তম। [আল্ মিসবাহ আল্ মুনীর/১৫২১] তাই এই রাতটি ইবাদতের মাধ্যমে অতিবাহিত করাই হবে আমাদের মূল উদ্দেশ্য।
দ্বিতীয়ত: জানা দরকার যে ইবাদত কাকে বলে? ইবাদত হচ্ছে, প্রত্যেক এমন আন্তরিক ও বাহ্যিক কথা ও কাজ যা, আল্লাহ পছন্দ করেন এবং তাতে সন্তুষ্ট থাকেন। [মাজমুউ ফাতাওয়া,১০/১৪৯]
উক্ত সংজ্ঞার আলোকে বলা যেতে পারে যে ইবাদত বিশেষ এক-দুটি কাজে সীমাবদ্ধ নয়। তাই আমরা একাধিক ইবাদতের মাধ্যমে এই রাতটি অতিবাহিত করতে পারি। নিম্নে কিছু উৎকৃষ্ট ইবাদত উল্লেখ করা হলঃ
১) ফরয নামায সমূহ ঠিক সময়ে জামাআ’তের সাথে আদায় করা: যেমন মাগরিব, ইশা এবং ফজরের নামায। তার সাথে সাথে সুন্নতে মুআক্কাদা, তাহিয়্যাতুল মসজিদ সহ অন্যান্য মাসনূন নামায আদায় করা।
২) কিয়ামে লাইলাতুল্ কদর করা: অর্থাৎ রাতে তারবীহর নামায আদায় করা। নবী (সা:) বলেনঃ “যে ব্যক্তি ঈমান ও নেকীর আশায় লাইলাতুল কদরে কিয়াম করবে (নামায পড়বে) তার বিগত গুনাহ ক্ষমা করা হবে”। [ফাতহুল বারী,৪/২৯৪] এই নামায জামাআতের সাথে আদায় করা উত্তম। অন্যান্য রাতের তুলনায় এই রাতে ইমাম দীর্ঘ কিরাআতের মাধ্যমে নামায সম্পাদন করতে পারেন। ইশার পর প্রথম রাতে কিছু নামায পড়ে বাকী নামায শেষ রাতে পড়াতে পারেন। একা একা নামায আদায়কারী হলে সে তার ইচ্ছানুযায়ী দীর্ঘক্ষণ ধরে নামায পড়তে পারে।
৩) বেশী বেশী দুআ করা: তন্মধ্যে সেই দুআটি বেশী বেশী পাঠ করা যা নবী (সাঃ) মা আয়েশা (রাযিঃ) কে শিখিয়েছিলেন। মা আয়েশা নবী (সাঃ) কে জিজ্ঞাসা করেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! যদি আমি লাইলাতুল কদর লাভ করি, তাহলে কি দুআ করবো? তিনি (সাঃ) বলেনঃ বলবে, (আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল্ আফওয়া ফা’ফু আন্নী”। অর্থ, হে আল্লাহ! তুমি ক্ষমাশীল। ক্ষমা পছন্দ কর, তাই আমাকে ক্ষমা কর”। [আহমদ,৬/১৮২]
এছাড়া বান্দা পছন্দ মত দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণকর যাবতীয় দুআ করবে। সে গুলো প্রমাণিত আরবী ভাষায় দুআ হোক কিংবা নিজ ভাষায় হোক। এ ক্ষেত্রে ইবাদতকারী একটি সুন্দর সহীহ দুআ সংকলিত দুআর বইয়ের সাহায্য নিতে পারে। সালাফে সালেহীনদের অনেকে এই রাতে অন্যান্য ইবাদতের চেয়ে দুআ করাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কারণ এতে বান্দার মুক্ষাপেক্ষীতা, প্রয়োজনীয়তা ও বিনম্রতা প্রকাশ পায়, যা আল্লাহ পছন্দ করেন।
৪) যিকর আযকার ও তাসবীহ তাহলীল করা: অবশ্য এগুলো দুআরই অংশ বিশেষ। কিন্তু বিশেষ করে সেই শব্দ ও বাক্য সমূহকে যিকর বলে, যার মাধ্যমে আল্লাহর প্রশংসা ও গুণগান করা হয়। যেমন, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”, “আল্ হামদু ল্লিল্লাহ” “সুবহানাল্লাহ”, “আল্লাহুআকবার” “আস্তাগফিরুল্লাহ”, “লা হাওলা ওয়ালা কুউআতা ইল্লা বিল্লাহ”। ইত্যাদি।
৫) কুরআন তিলাওয়াত: কুরআন পাঠ একটি বাচনিক ইবাদত, যা দীর্ঘ সময় ধরে করা যেতে পারে। যার এক একটি অক্ষর পাঠে রয়েছে এক একটি নেকী। নবী (সা:) বলেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি অক্ষর পড়বে, সে তার বিনিময়ে একটি নেকী পাবে… আমি একথা বলছি না যে, আলিফ,লাম ও মীম একটি অক্ষর; বরং আলিফ একটি অক্ষর লাম একটি অক্ষর এবং মীম একটি অক্ষর”। [তিরমিযী, তিনি বর্ণনাটিকে হাসান সহীহ বলেন]
এছাড়া কুরআন যদি কিয়ামত দিবসে আপনার সুপারিশকারী হয়, তাহলে কতই না সৌভাগ্যের বিষয়! নবী (সাঃ) বলেনঃ “তোমরা কুরআন পড়; কারণ সে কিয়ামত দিবসে পাঠকারীর জন্য সুপারিশকারী হিসাবে আগমন করবে”। [মুসলিম]
৬) সাধ্যমত আল্লাহর রাস্তায় কিছু দান-সাদকা করা: নবী (সা:) বলেনঃ “সাদাকা পাপকে মুছে দেয়, যেমন পানি আগুনকে নিভিয়ে দেয়”। [সহীহুত তারগবি

শবে কদরের নামাজ পড়ার নিয়মঃ
নফল নামাজ : ন্যূনতম বার রাকাত থেকে যত সম্ভব পড়া যেতে পারে। এ জন্য সাধারণত সুন্নতের নিয়মে ‘দুই রাকাত নফল পড়ছি’ এ নিয়তে নামাজ শুরু করে শেষ করতে হবে।
এ জন্য সূরা ফাতেহার সাথে আপনার জানা যেকোনো সূরা মেলালেই চলবে। ৩৩ বার সূরা আল কদর, ৩৩ বার ইখলাস ইত্যাদি উল্লেখ করা আছে। তবে সে নিয়মে পড়লেও অসুবিধার কারণ নেই।
হাদিস শরীফে বর্ণিত আছে, হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি ৪ রাকাত নামাজ ক্দরের রাতে আদায় করবে এবং উক্ত নামাজের প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহার পর ২১ বার করে সূরা ইখলাছ পাঠ করবে, আল্লাহ তা’য়ালা ওই ব্যক্তিকে সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর ন্যায় নিষ্পাপ করে দেবেন এবং বেহেশতের মধ্যে এক মনোমুগ্ধকর মহল তৈরি করে দেবেন।
অপর এক হাদিসে বর্ণিত রয়েছে, হযরত রাসূল (সা.) এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি ক্দরের রজনীতে ৪ রাকাত নামাজ আদায় করবে এবং উহার প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহার পর সূরা কদর ও সূরা ইখলাছ তিনবার করে পাঠ করবে, নামাজ শেষে সিজদায় গিয়ে নিম্নের দোয়াটি কিছু সময় পাঠ করে আল্লাহর দরবারে যা-ই প্রার্থনা করবে তিনি তাই কবুল করবেন এবং তার প্রতি অসংখ্য রহমত বর্ষিত করবেন।
লাইলাতুল কদরের ফজিলতগুলো সংক্ষেপে
এ রাতটি হাজার মাস হতে উত্তম- কল্যাণময় (আল কুরআন)
এ রাতেই পবিত্র কুরআন নাযিল করা হয়েছে। (আল কুরআন)
এ রাতে ফেরেস্তা নাযিল হয় এবং আবেদ বান্দাহদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন।
ফজর পর্যন্ত এ রাতে পুরাপুরি শান্তি ও নিরাপত্তার (আল কুরআন)
এ রাতে প্রত্যেকটি ব্যাপারে অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত ও সুদৃঢ় ফায়সালা জারি করা হয়। (আল কুরআন)
এ রাতে ইবাদতে মশগুল বান্দাদের জন্য অবতরণকৃত ফেরেশতারা দু’আ করেন। (হাদিস)

